• ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ শনিবার রাত ১২:৪৮
S M Tajul Islam আগস্ট ২৯, ২০২৫

দুর্নীতিতে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সাবেক কাস্টমস কমিশনার বেলাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেনাপোল কাস্টম হাউসের সাবেক কমিশনার এবং শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের (ডেডো) মহাপরিচালক বেলাল হোসাইন চৌধুরী দুর্নীতির বরপুত্র হয়েও রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। চাকরি জীবনে যেখানেই পদায়ন হয়েছেন, সেখানেই গড়ে তুলেছেন অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষের সিন্ডিকেট। গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বেনাপোল কাস্টমস বিভাগে থাকা অবস্থায় জব্দকৃত স্বর্ণ বিক্রিসহ নানা বিষয়ে আলোচিত এই সাবেক কর্মকর্তা নিজের পরিচয় দিতেন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে। আর এ কারণেই পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি। দুই দফা দুদক থেকে দায়মুক্তিও পেয়েছেন।

এবারে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। ইতোমধ্যে সংস্থাটি বেলাল হোসাইন চৌধুরীর শত শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে। দুদকের আবেদনে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত বেলাল হোসাইন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী হোসনা ফেরদৌস সুমির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘অনুসন্ধানকালে জানা যায়, বেলাল হোসাইন চৌধুরী সপরিবারে গোপনে দেশত্যাগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি পালিয়ে গেলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া অনুসন্ধানেও বিঘ্ন ঘটবে। তাই সুষ্ঠু অনুসন্ধান কার্যক্রমের স্বার্থে তাদের বিদেশযাত্রা রোধে আদালতে আবেদন করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাকরিজীবনে সব সময়ই ভালো পোস্টিং পেয়েছেন বেলাল হোসাইন। তার সম্পদের নেশা। বর্তমানে তিনি রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (মুসক) হিসেবে চাকরি করেছেন। এর আগে তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ার একাধিক অনুসন্ধান চললেও ক্ষমতার কারসাজিতে তিনি তদন্ত থামিয়ে দিয়েছেন।

বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নামে-বেনামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাড়ি, গাড়ি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর দুদকের হাজির হওয়ার জন্য তলবও করা হয়েছিল।

এরপর ২০২২ সালের ১ জুন তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু সেসব থোড়াই কেয়ার করে, ধামাচাপা দিয়ে তিনি দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকেন।

বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বেনাপোলের সাবেক এই কাস্টমস কমিশনারের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, তার খাটানো প্রভাবের জেরে, সে সময় রাজস্ব বোর্ডের গঠিত তদন্ত কমিটি বেলাল হোসেনের অবৈধ সম্পদের কোনো খোঁজ পায়নি মর্মে প্রতিবেদন দেয়।

দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট টিমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বেলাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বিদেশেও। কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি আছে এই কর্মকর্তার, যেখানে তার ছেলে-মেয়েরা বসবাস করেন। আছে দুবাই মেরিনায় ফ্ল্যাট, ডাউনটাউনে বাড়ি, এমনকি স্পেস কিনেছেন বুর্জ আল খলিফায়। বিনিয়োগ সূত্রে পেয়েছেন দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসা। দুবাই ভ্রমণে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না। অনুমতি ব্যতীত ভ্রমণ এবং বিনা ছুটিতে সেদেশে অবস্থান করা তার কাছে ‘ডাল-ভাত’। দুর্নীতির টাকায় স্ত্রী, ভাইবোন ও শ্যালকের নামেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বেলাল। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি এবং বিটকয়েন সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে।

অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের (ডেডো) মহাপরিচালক থাকাকালীন ২০২৩ সালে তুরাগ এলাকায় লামইয়া ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুর রাজ্জাকের কাছে রাতের অন্ধকারে লোক পাঠান তিনি। এই ঘটনায় সেই ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগ করেছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে। তবে এই অভিযোগের তদন্তও আলোর মুখ দেখেনি বেলালের প্রভাবে।

শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালীন চাঁদাবজির অভিযোগই শুধু নয়, বেলালের বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি লিখিত অভিযোগ জমা হয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। তবে অভিযোগের তদন্ত শুরু হলেই নিজের ‘সাবেক ছাত্রলীগ নেতা’ পরিচয় কাজে লাগিয়ে থামিয়ে দিতেন পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেলাল হোসাইন চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। খুদেবার্তা পাঠালেও উত্তর দেননি তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *