• ৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ মঙ্গলবার বিকাল ৫:৩৩
S M Tajul Islam মার্চ ৩১, ২০২৬

ঐতিহাসিক মুসা খাঁ মসজিদ সংস্কারে অনুদান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় অবস্থিত মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘মুসা খাঁ মসজিদ’ সংস্কার ও সংরক্ষণে প্রায় তিন কোটি টাকার অনুদান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাম্বাসেডর ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’ (এএফসিপি) প্রকল্পের আওতায় এ অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবছরের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত তিন বছরব্যাপী এ প্রকল্পের কাজ চলবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩০০ মার্কিন ডলার।

মুঘল আমলের এই সুউচ্চ প্ল্যাটফর্মের মসজিদের আদি নকশা এবং নির্মাণ উপকরণের সঠিকতা বজায় রেখে সংস্কার করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রকল্পের আওতায় মসজিদের একটি ফটোরিয়ালিস্টিক থ্রি-ডি মডেল তৈরি করা হবে। এছাড়া স্থাপত্য বিষয়ক নথিপত্র তৈরি এবং মসজিদের কাঠামোগত শক্তি বিশ্লেষণ করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল সংলগ্ন এই মসজিদ এলাকায় পর্যটন কার্যক্রম উন্নত করাও এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় মসজিদের সামনে এ প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ১৭শ শতাব্দীর মুসা খান মসজিদের সংস্কার ও সংরক্ষণের এই উদ্যোগটি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ এবং আমি এর অংশ হতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ‘অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রেসারভেশন’ প্রজেক্টের মাধ্যমে উদার সহযোগিতার জন্য আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এ চমৎকার ও অর্থবহ সহযোগিতা বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অটুট বন্ধুত্বের একটি নিদর্শন এবং মানবতার অমূল্য ঐতিহ্য রক্ষার প্রতি আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, আমাদের জাতির গর্ব ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন নগর জনপদ থেকে শুরু করে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশ, এরপর সুলতানি ও মুঘল আমল, ঔপনিবেশিক যুগ এবং সবশেষে আমাদের আজকের স্বাধীন বর্তমান পর্যন্ত—আমাদের সভ্যতা হাজার হাজার বছর ব্যাপী বিস্তৃত। প্রতিটি সভ্যতা ও শাসন আমলের নিজস্ব ঐতিহ্যের স্থান রয়েছে, যা বিভিন্ন সময় ও ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বৈচিত্র্যময় উপাদানগুলো আমাদের জাতীয় পরিচয়, একতা ও সংহতির প্রতীক।

এ সম্পদগুলো রক্ষা করা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি একটি পবিত্র কর্তব্য যা আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

তিনি বলেন, মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এই মুসা খান মসজিদ প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার পর আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে এটি তার ঐতিহাসিক পরিচয় ও মর্যাদা ফিরে পাবে। আগামী দিনগুলোতেও আমাদের এ সম্মিলিত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে, যা সাংস্কৃতিক পর্যটনকে উৎসাহিত করবে, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করবে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় আমাদের তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মুসা খাঁ মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলী এবং স্থানীয় রূপান্তরের এক অনন্য সংমিশ্রণকে ফুটিয়ে তোলে। ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থিত হওয়ার কারণে এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্যে পরিণত করেছে, যা শিক্ষার্থী, গবেষক এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে এ প্রকল্পটি একাডেমিক গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং ঐতিহ্যবাহী পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় বক্তব্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের কয়েকটি প্রকল্পে মার্কিন সহযোগিতায় কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত দুই দশক ধরে ‘অ্যাম্বাসেডর ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পেরে আমরা গর্বিত। এ ফান্ডের অধীনে এটি আমাদের ১৩তম প্রকল্প। আমরা স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির ওপর বেশ কিছু প্রকল্প সম্পন্ন করেছি। আমি নিজেই এ পর্যন্ত তিনটি প্রকল্প পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে আমি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শন করেছি, যেটিতে আমাদের সহযোগিতা রয়েছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এস এম সুলতানের শিল্পকর্মগুলো পুনরুদ্ধারে যে চমৎকার কাজ করছে, আমি কয়েক সপ্তাহ আগে তা পরিদর্শন করেছি। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে লালবাগ কেল্লার সংস্কার কাজে আমাদের আগের একটি অংশীদারিত্ব ছিল, যা আমি আমার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই পরিদর্শন করেছিলাম।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এই সংস্কার কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২৩৫ হাজার মার্কিন ডলার প্রদান করবে। পাশাপাশি সংস্কার কাজে আমেরিকার কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলও সহায়তা করবে। এটি কেবল এই সুন্দর স্থাপত্য পুনরুদ্ধারের একটি প্রকল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশি প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সংস্কারকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও কাজ করবে এবং একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করবে যা বিশ্বজুড়ে গবেষকরা ব্যবহার করতে পারবেন। আমরা ভবিষ্যতে এখানে (বাংলাদেশে) আরও প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রত্যাশা করছি।

প্রসঙ্গত, মুসা খাঁ মসজিদটি বাংলার বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁর নামে পরিচিত, যা মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃত। অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিরা এ মসজিদটি পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাবিহা আলম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *